সূরাহ আল-বাকারার তাফসির,আয়াত ১১-১৫

 তাফসিরে ইবনে কাসিরঃ-

সূরাহ আল-বাকারার তাফসির,আয়াত ১১-১৫ঃ-

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

আয়াত নং ১১ঃ-

وَ اِذَا قِیۡلَ لَہُمۡ لَا تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ ۙ  قَالُوۡۤا اِنَّمَا نَحۡنُ مُصۡلِحُوۡنَ ﴿۱۱﴾

তাদেরকে যখন বলা হয়, ‘পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না’, তারা বলে, ‘আমরা তো শান্তি স্থাপনকারীই।’

আয়াত নং ১২ঃ-

اَلَاۤ اِنَّہُمۡ ہُمُ الۡمُفۡسِدُوۡنَ وَ لٰکِنۡ لَّا یَشۡعُرُوۡنَ ﴿۱۲﴾

সাবধান! এরাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, (১) কিন্তু এরা তা অনুভব করতে পারে না। (১) 'ফাসাদ' (অশান্তি, হাঙ্গামা, সন্ত্রাস) হল 'সালাহ' (শান্তি বা সংস্কার)-এর বিপরীত। কুফরী ও পাপাচারের কারণে যমীনে ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। আর আল্লাহর আনুগত্যে নিরাপত্তা ও শান্তি পাওয়া যায়। প্রত্যেক যুগের মুনাফিক্বদের কাজই হল যে, তারা অশান্তি সৃষ্টি করে, অন্যায়ের প্রচার-প্রসার করে এবং আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, কিন্তু তারা মনে করে বা দাবী করে যে, তারা সংস্কার, শান্তি ও উন্নতি করার চেষ্টায় লেগে আছে।

আয়াত নং ১৩ঃ-

وَ  اِذَا قِیۡلَ لَہُمۡ اٰمِنُوۡا کَمَاۤ اٰمَنَ النَّاسُ قَالُوۡۤا اَنُؤۡمِنُ کَمَاۤ اٰمَنَ السُّفَہَآءُ ؕ اَلَاۤ اِنَّہُمۡ ہُمُ  السُّفَہَآءُ  وَ لٰکِنۡ لَّا  یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۳﴾

যখন তাদের বলা হয়, যে সব লোক ঈমান এনেছে তাদের মতো তোমরাও ঈমান আনো। তারা বলে, নির্বোধেরা যেমন ঈমান এনেছে, আমরাও কি তেমনি ঈমান আনবো? আসলে তারাই নির্বোধ। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। উপর্যুক্ত আয়াতের ভাবার্থ এই যে, যখন এই মুনাফিকদেরকে সাহাবীগণের মতো মহান আল্লাহর ওপর তাঁর ফিরিশতাগণের ওপর, কিতাবসমূহের ওপর এবং রাসূলগণ (আঃ)-এর ওপর ঈমান আনতে, মৃত্যুর পর পুনর্জীবন এবং জান্নাত ও জাহান্নামের সত্যতা স্বীকার করতে ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্য বরণ করতে, ভালো কাজ করতে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, তখন এই অভিশপ্ত দলটি এরূপ ঈমান আনাকে নির্বোধদের ঈমান আনা বলে আখ্যায়িত করে থাকে। (তাফসীর তাবারী ১/২৯৩) রাবী‘ ইবনু আনাস (রহঃ) এবং ‘আবদুর রহমান ইবনু যায়দ আসলাম (রহঃ)-এর তাফসীরেও এ কথা বর্ণিত হয়েছে। (তাফসীর তাবারী ১/২৯৪) মুনাফিকরা বলতোঃ আমরা ও তারা একই মতাদর্শে রয়েছি এবং একই পথ অনুসরণ করছি তা কি করে হতে পারে, অথচ আমরাতো দেখছি যে, তারাতো নির্বোধের দল? এখানে নির্বোধ বলতে এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, তারা অশিক্ষিত, সাধারণ মানের মানুষ যাদের ভালো-মন্দের জ্ঞান খুব কমই রয়েছে। অধিকাংশ বিজ্ঞজনের মতে, নির্বোধ বা বোকা বলতে আল্লাহ তা‘আলা শিশু বা বাচ্চাদের বুঝিয়েছেন, যেমন কুর’আন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ ﴿وَ لَا تُؤْتُوا السُّفَهَآءَ اَمْوَالَكُمُ الَّتِیْ جَعَلَ اللّٰهُ لَكُمْ قِیٰمًا﴾ মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য যে ধন-সম্পত্তি নির্ধারণ করেছেন তা বুদ্ধিহীনদেরকে প্রদান করো না। (৪ নং সূরাহ্ নিসা, আয়াত নং ৫) ঐ মুশরিকদের ওপর এখানেও বিশ্বপ্রভু মহান আল্লাহ জোর দিয়ে বলছেন যে, নির্বোধ তো তারাই, কিন্তু সাথে সাথে তারা এতোই গণ্ডমূর্খ যে, নিজেদের নির্বুদ্ধিতার অনুভূতিও রাখে না এবং মূর্খতা ও ভ্রষ্টতা অনুধাবনও করতে পারে না। এর চেয়ে বেশি তাদের অন্ধত্ব, দৃষ্টিহীনতা এবং সুপথ থেকে দূরে সরে থাকা আর কি হতে পারে?

আয়াত নং ১৪ঃ-

وَ  اِذَا لَقُوا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚۖ وَ  اِذَا خَلَوۡا اِلٰی شَیٰطِیۡنِہِمۡ ۙ قَالُوۡۤا اِنَّا مَعَکُمۡ ۙ اِنَّمَا نَحۡنُ مُسۡتَہۡزِءُوۡنَ ﴿۱۴﴾

যখন তারা মু’মিনদের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শায়তানদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, ‘আমরা তোমাদের সাথেই আছি, আমরা শুধু তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করি মাত্র’। মুনাফিকদের ধূর্ততা এসব মুনাফিকরা মুসলিমদের নিকট এসে নিজেদের ঈমান, বন্ধুত্ব ও মঙ্গল কামনার কথা প্রকাশ করে তাদেরকে ধোঁকায় ফেলতে চায়, যাতে জান ও মালের নিরাপত্তা এসে যায় এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও ভাগ পাওয়া যায়। আর যখন নিজেদের দলে থাকে তখন তাদের হয়েই কথা বলে। মানব ও জ্বিন শায়তান شياطين-এর অর্থ হচ্ছে নেতা, বড় দলপতি এবং সর্দার যেমন আহবার ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ, কুরাইশ কাফিরদের সর্দারগণ এবং কপটগণ। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এবং ইবনু মাস‘উদ (রাঃ) সহ আরো কিছু সাহাবীগণের মতে شياطين হচ্ছে তাদের প্রধান, কাফির সর্দারগণ এবং তাদের সমবিশ্বাসী লোকও বটে। ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, প্রত্যেক পথভ্রষ্টকারী ও অবাধ্যকে شَيْطَان বলা হয়। তারা জ্বিন বা দানব থেকেই হোক অথবা মানব থেকেই হোক। কুর’আনুল কারীমেও এসেছেঃ ﴿وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِیٍّ عَدُوًّا شَیٰطِیْنَ الْاِنْسِ وَ الْجِنِّ یُوْحِیْ بَعْضُهُمْ اِلٰى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًا﴾ আর এমনিভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য বহু শায়তানকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি; তাদের কতক মানুষ শায়তানের মধ্যে হতে এবং কতক জ্বিন শায়তানের মধ্য হতে হয়ে থাকে, এরা একে অন্যকে কতোগুলো মনোমুগ্ধকর, ধোঁকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথা দ্বারা প্ররোচিত করে থাকে। (৬ নং সূরাহ্ আন‘আম, আয়াত নং ১১২) হাদীসে এসেছে মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ نَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شَيَاطِيْنِ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ ‘আমরা জ্বিন ও মানুষের শায়তান থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আবূ যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘হে মহান আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মানুষের মধ্যে কি শায়তান আছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘হ্যাঁ। (হাদীসটি য‘ঈফ। মুসনাদ আহমাদ, ৫/১৭৮,১৭৯, ২৬৫, সুনান নাসাঈ ৮/৫৫২) উপহাস বা তামাশা যখন এই মুনাফিকরা মুসলিমদের সাথে মিলিত হয় তখন বলেঃ ‘আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি, অর্থাৎ যেমন তোমরা, তেমনই আমরা, আমরা তো তাদেরকে উপহাস করছিলাম।’ (তাফসীর তাবারী ১/৩০০) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ), রাবী‘ ইবনু আনাস (রহঃ) এবং কাতাদাহ (রহঃ)-এর তাফসীরও এটাই। (তাফসীর তাবারী ১/৩০০) মহান আল্লাহ শায়তানদের উত্তর দিতে গিয়ে তাদের প্রতারণামূলক কাজের মুকাবিলায় বলেন যে, আল্লাহ তা‘আলাও তাদেরকে উপহাস করবেন এবং অবাধ্যতার মধ্যে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরতে দিবেন। যেমন কুর’আন মাজীদে এক জায়গায় আছেঃ ﴿یَوْمَ یَقُوْلُ الْمُنٰفِقُوْنَ وَ الْمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْۚ قِیْلَ ارْجِعُوْا وَرَآءَكُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا فَضُرِبَ بَیْنَهُمْ بِسُوْرٍ لَّه بَابٌ بَاطِنُه فِیْهِ الرَّحْمَةُ وَ ظَاهِرُه مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ﴾ কিয়ামতের দিন মুনাফিক নর-নারী মু’মিনদের বলবেঃ তোমরা আমাদের জন্য একটু থামো, যাতে আমরা তোমাদের জ্যোতির কিছু অংশ গ্রহণ করতে পারি। বলা হবে, তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং আলোর সন্ধান করো। অতঃপর উভয়ের মাঝে স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, এর অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বহির্ভাগে থাকবে শাস্তি। (৫৭ নং সূরাহ্ হাদীদ, আয়াত নং ১৩) যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ﴿وَ لَا یَحْسَبَنَّ الَّذِیْنَ كَفَرُوْۤا اَنَّمَا نُمْلِیْ لَهُمْ خَیْرٌ لِّاَنْفُسِهِمْ١ؕ اِنَّمَا نُمْلِیْ لَهُمْ لِیَزْدَادُوْۤا اِثْمًا﴾ ‘কাফিরগণ যেন কিছুতেই এ ধারণা পোষণ না করে যে, তাদের আমি যে অবকাশ দিয়েছি তা তাদের জন্য মঙ্গলজনক। আমি তাদের শুধু এজন্য অবকাশ দেই যে, যেন তারা তাদের পাপকে বাড়িয়ে দেয়।’ (৩ নং সূরাহ্ আলি ‘ইমরান, আয়াত নং ১৭৮) তারপর তিনি বলেনঃ এটা এবং এ ধরনের বিষয়ই আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিক এবং মুশরিকদের উপহাস বা হাসি-ঠাট্টাচ্ছলে উল্লেখ করেছেন। এরকমই আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ﴿وَ مَكَرُوْا وَ مَكَرَ اللّٰهُ وَ اللّٰهُ خَیْرُ الْمٰكِرِیْنَ﴾ কাফিররা ষড়যন্ত্র করেছিলো এবং মহান আল্লাহও কৌশল করলেন, আর মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী। (৩ নং সূরাহ্ আলি ‘ইমরান, আয়াত নং ৫৪) মুনাফিকরা তাদের ষড়যন্ত্রের জন্য শাস্তি পাবে মহান আল্লাহর সত্ত্বা প্রতারণা ও উপহাস থেকে পবিত্র। মহান আল্লাহ কাফিরদের প্রতারণা ও বিদ্রƒপের উপযুক্ত প্রতিফল দিবেন। কাজেই বিনিময়ে পূর্বোক্ত আয়াতের ঐ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। দু’টি শব্দের অর্থ দুই জায়গায় পৃথক পৃথক হবে। যেমন কুর’আন মাজীদে আছেঃ ﴿وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَةٍ سَیِّئَةٌ مِّثْلُهَا١ۚ فَمَنْ عَفَا وَ اَصْلَحَ فَاَجْرُهٗ عَلَى اللّٰهِ﴾ মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোষ-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে। (৪২ নং সূরাহ্ শূরা, আয়াত নং ৪০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ ﴿فَمَنِ اعْتَدٰى عَلَیْكُمْ فَاعْتَدُوْا عَلَیْهِ﴾ তারপর যে কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করে, তাহলে সে তোমাদের প্রতি যেরূপ অত্যাচার করবে তোমরাও তার প্রতি সেরূপ অত্যাচার করো। (২ নং সূরাহ্ বাকারাহ, আয়াত নং ১৯৪) এতে বুঝা গেলো যে, প্রতিশোধ গ্রহণ করা অন্যায় নয়। বাড়াবাড়ি মুকাবিলায় প্রতিশোধ নেয়া বাড়াবাড়ি নয়। কিন্তু দু’স্থানে একই শব্দ আছে, অথচ প্রথম অন্যায় বাড়াবাড়ি হচ্ছে যুল্ম এবং দ্বিতীয় অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে সুবিচার। আর একটি ভাবার্থ এই যে, মুনাফিকরা তাদের এই নাপাক নীতি দ্বারা মুসলিমগণকে উপহাস ও বিদ্রƒপ করতো। মহান আল্লাহও তাদের সাথে এরূপই করলেন যে, দুনিয়ায় তাদেরকে তিনি নিরাপত্তা দান করলেন, তারা এতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলো, অথচ এটা অস্থায়ী নিরাপত্তা। কিয়ামতের দিন তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। এখানে যদিও তাদের জান ও মাল রক্ষা পেলো, কিন্তু মহান আল্লাহর নিকট তারা বেদনাদায়ক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে। মুনাফিকদেরকে উদ্ভ্রান্তের মধ্যে ছেড়ে দেয়ার অর্থ কী ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) উপরোক্ত কথাটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা বিনা কারণে যে ধোঁকা ও বিদ্রপ হয়, মহান আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে প্রতিশোধ হিসেবে মহান আল্লাহর দিকে এসব শব্দের সম্বন্ধ করায় কোন দোষ নেই। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-ও এ কথাই বলেন যে, এটা তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ ও শাস্তি। يَمُدُّهُمْ-এর অর্থ ‘ঢিল দেয়া (তাফসীর তাবারী ১/৩১১) এবং বাড়ানো’ (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/৫৭) বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ ﴿اَیَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِه مِنْ مَّالٍ وَّ بَنِیْنَۙ نُسَارِعُ لَهُمْ فِی الْخَیْرٰتِ بَلْ لَّا یَشْعُرُوْنَ﴾ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্য স্বরূপ যে ধন ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি দান করি তার দ্বারা তাদের জন্য সর্বপ্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না। (২৩ নং সূরাহ্ মু’মিনূন, আয়াত নং ৫৫-৫৬) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ ﴿ سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَیْثُ لَا یَعْلَمُوْنَ﴾ আমি তাদেরকে এমনভাবে ক্রমে ক্রমে ধরবো যে, তারা জানতে পারবে না। (৬৮ নং সূরাহ্ কলম, আয়াত নং ৪৪) কতিপয় তাফসীর কারকের মতে তারা যখনই কোন অন্যায় করে বসবে এর বিনিময়ে তাদের সম্পদ-সুখ স্বাচ্ছন্দ অর্জিত হবে। যা প্রকৃত অর্থে শাস্তিই বটে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُكِّرُوْا بِه فَتَحْنَا عَلَیْهِمْ اَبْوَابَ كُلِّ شَیْءٍ حَتّٰۤى اِذَا فَرِحُوْا بِمَاۤ اُوْتُوْۤا اَخَذْنٰهُمْ بَغْتَةً فَاِذَا هُمْ مُّبْلِسُوْنَ. فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ. তাদেরকে যে নাসীহত করা হয়েছিলো তারা যখন তা ভুলে গেলো, তখন আমি তাদের জন্য যাবতীয় নি‘য়ামতের দরজা খুলে দিলাম; পরিশেষে, তাদের যা দেয়া হলো তাতে তারা যখন আনন্দে মেতে উঠলো, হঠাৎ করে তাদের ধরে বসলাম। তখন যাবতীয় কল্যাণ থেকে তারা নিরাশ হয়ে গেলো। অতঃপর যারা যুল্ম করেছিলো তাদের শিকড় কেটে দেয়া হলো। আর সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালকের, যিনি অন্যায়কারীদের শিকড় কেটে দিয়েছেন। (৬ নং সূরাহ আল আন‘আম, আয়াত নং ৪৪ ও ৪৫) ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন, সঠিক কথা হলো তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যই তাদেরকে অধিক পরিমাণে অবকাশ দেয়া হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿وَ نُقَلِّبُ اَفْـِٕدَتَهُمْ وَ اَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ یُؤْمِنُوْا بِهۤ اَوَّلَ مَرَّةٍ وَّ نَذَرُهُمْ فِیْ طُغْیَانِهِمْ یَعْمَهُوْنَ﴾ ‘আর যেহেতু তারা প্রথম বার ঈমান আনেনি, এর ফলে তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দিবো এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই বিভ্রান্ত থাকতে দিবো।’ (৬ নং সূরাহ্ আন‘আম, আয়াত নং ১১০। তাফসীর তাবারী ১/৩০৭) ‘তুগিয়ান’ এ শব্দটি এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে সীমালঙ্ঘন করা হিসেবে, যেমন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াতে উল্লেখ করেনঃ ﴿ اِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَآءُ حَمَلْنٰكُمْ فِی الْجَارِیَةِ﴾ যখন প্লাবন হয়েছিলো তখন আমি তোমাদেরকে অর্থাৎ মানব জাতিকে আরোহণ করিয়েছিলাম নৌযানে। (৬৯ নং সূরাহ্ হাক্কাহ, আয়াত নং ১১) যাহ্হাক ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে في طغيانهم يعمهون এর তাফসীরে বলেন, ‘তারা তাদের কুফরীতে ঘোরপাক খাচ্ছে।’ সুদ্দী, আবুল ‘আলিয়া, কাতাদাহ, রাবী‘ ইবনু আনাস, মুজাহিদ, আবূ মালিক এবং ‘আব্দুর রহমান ইবনু যায়দও বলেছেন ‘তারা তাদের কুফরী ও ভ্রষ্টতার মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ‘আমাহ’ শব্দটি প্রয়োগ করার অর্থ হচ্ছে পথচ্যুত হওয়া বা সরে যাওয়া। তিনি আরো বলেন যে, ‘তুগইয়ানিহীম ইয়া‘মাহুন’ হলো তাদেরকে অবিশ্বাস এবং বিপথগামী ঘিরে রেখেছে যার ফলে তারা সন্দেহের ঘোরে নিপতিত রয়েছে এবং তা থেকে বের হয়ে আসার সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছেনা। কারণ মহান আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং দৃষ্টিশক্তিকে রুদ্ধ করে দিয়েছেন। ফলে তারা হিদায়াতের পথ খুঁজে পাচ্ছে না এবং তাদের পথচ্যুতি থেকেও বেরিয়ে আসতে পারছে না। (তাফসীর তাবারী ১/৩০৯) কেউ কেউ বলেন, العمي বলা চোখের অন্ধত্বকে আর العمه বলা হয় অন্তরের অন্ধত্বকে। অবশ্য অন্তরের অন্ধত্ব বুঝাতেও العمي ব্যবহার হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿لَا تَعْمَى الْاَبْصَارُ وَلٰكِنْ تَعْمَى الْقُلُوْبُ الَّتِیْ فِی الصُّدُوْرِ﴾ প্রকৃতপক্ষে চোখ অন্ধ নয়, বরং বুকের ভিতর যে হৃদয় আছে তা-ই অন্ধ। (২২ সং সূরাহ আল হাজ্জ, আয়াত নং ৪৬)

আয়াত নং ১৫ঃ- 

اَللّٰہُ یَسۡتَہۡزِئُ بِہِمۡ وَ یَمُدُّہُمۡ  فِیۡ طُغۡیَانِہِمۡ یَعۡمَہُوۡنَ ﴿۱۵﴾

মহান আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন এবং তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের মতো তাদের ঘুরে ফেরার অবকাশ দেন। মুনাফিকদের ধূর্ততা এসব মুনাফিকরা মুসলিমদের নিকট এসে নিজেদের ঈমান, বন্ধুত্ব ও মঙ্গল কামনার কথা প্রকাশ করে তাদেরকে ধোঁকায় ফেলতে চায়, যাতে জান ও মালের নিরাপত্তা এসে যায় এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও ভাগ পাওয়া যায়। আর যখন নিজেদের দলে থাকে তখন তাদের হয়েই কথা বলে। মানব ও জ্বিন শায়তান شياطين-এর অর্থ হচ্ছে নেতা, বড় দলপতি এবং সর্দার যেমন আহবার ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ, কুরাইশ কাফিরদের সর্দারগণ এবং কপটগণ। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এবং ইবনু মাস‘উদ (রাঃ) সহ আরো কিছু সাহাবীগণের মতে شياطين হচ্ছে তাদের প্রধান, কাফির সর্দারগণ এবং তাদের সমবিশ্বাসী লোকও বটে। ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, প্রত্যেক পথভ্রষ্টকারী ও অবাধ্যকে شَيْطَان বলা হয়। তারা জ্বিন বা দানব থেকেই হোক অথবা মানব থেকেই হোক। কুর’আনুল কারীমেও এসেছেঃ ﴿وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِیٍّ عَدُوًّا شَیٰطِیْنَ الْاِنْسِ وَ الْجِنِّ یُوْحِیْ بَعْضُهُمْ اِلٰى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًا﴾ আর এমনিভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য বহু শায়তানকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি; তাদের কতক মানুষ শায়তানের মধ্যে হতে এবং কতক জ্বিন শায়তানের মধ্য হতে হয়ে থাকে, এরা একে অন্যকে কতোগুলো মনোমুগ্ধকর, ধোঁকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথা দ্বারা প্ররোচিত করে থাকে। (৬ নং সূরাহ্ আন‘আম, আয়াত নং ১১২) হাদীসে এসেছে মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ نَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شَيَاطِيْنِ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ ‘আমরা জ্বিন ও মানুষের শায়তান থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আবূ যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘হে মহান আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মানুষের মধ্যে কি শায়তান আছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘হ্যাঁ। (হাদীসটি য‘ঈফ। মুসনাদ আহমাদ, ৫/১৭৮,১৭৯, ২৬৫, সুনান নাসাঈ ৮/৫৫২) উপহাস বা তামাশা যখন এই মুনাফিকরা মুসলিমদের সাথে মিলিত হয় তখন বলেঃ ‘আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি, অর্থাৎ যেমন তোমরা, তেমনই আমরা, আমরা তো তাদেরকে উপহাস করছিলাম।’ (তাফসীর তাবারী ১/৩০০) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ), রাবী‘ ইবনু আনাস (রহঃ) এবং কাতাদাহ (রহঃ)-এর তাফসীরও এটাই। (তাফসীর তাবারী ১/৩০০) মহান আল্লাহ শায়তানদের উত্তর দিতে গিয়ে তাদের প্রতারণামূলক কাজের মুকাবিলায় বলেন যে, আল্লাহ তা‘আলাও তাদেরকে উপহাস করবেন এবং অবাধ্যতার মধ্যে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরতে দিবেন। যেমন কুর’আন মাজীদে এক জায়গায় আছেঃ ﴿یَوْمَ یَقُوْلُ الْمُنٰفِقُوْنَ وَ الْمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْۚ قِیْلَ ارْجِعُوْا وَرَآءَكُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا فَضُرِبَ بَیْنَهُمْ بِسُوْرٍ لَّه بَابٌ بَاطِنُه فِیْهِ الرَّحْمَةُ وَ ظَاهِرُه مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ﴾ কিয়ামতের দিন মুনাফিক নর-নারী মু’মিনদের বলবেঃ তোমরা আমাদের জন্য একটু থামো, যাতে আমরা তোমাদের জ্যোতির কিছু অংশ গ্রহণ করতে পারি। বলা হবে, তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং আলোর সন্ধান করো। অতঃপর উভয়ের মাঝে স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, এর অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বহির্ভাগে থাকবে শাস্তি। (৫৭ নং সূরাহ্ হাদীদ, আয়াত নং ১৩) যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ ﴿وَ لَا یَحْسَبَنَّ الَّذِیْنَ كَفَرُوْۤا اَنَّمَا نُمْلِیْ لَهُمْ خَیْرٌ لِّاَنْفُسِهِمْ١ؕ اِنَّمَا نُمْلِیْ لَهُمْ لِیَزْدَادُوْۤا اِثْمًا﴾ ‘কাফিরগণ যেন কিছুতেই এ ধারণা পোষণ না করে যে, তাদের আমি যে অবকাশ দিয়েছি তা তাদের জন্য মঙ্গলজনক। আমি তাদের শুধু এজন্য অবকাশ দেই যে, যেন তারা তাদের পাপকে বাড়িয়ে দেয়।’ (৩ নং সূরাহ্ আলি ‘ইমরান, আয়াত নং ১৭৮) তারপর তিনি বলেনঃ এটা এবং এ ধরনের বিষয়ই আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিক এবং মুশরিকদের উপহাস বা হাসি-ঠাট্টাচ্ছলে উল্লেখ করেছেন। এরকমই আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ﴿وَ مَكَرُوْا وَ مَكَرَ اللّٰهُ وَ اللّٰهُ خَیْرُ الْمٰكِرِیْنَ﴾ কাফিররা ষড়যন্ত্র করেছিলো এবং মহান আল্লাহও কৌশল করলেন, আর মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী। (৩ নং সূরাহ্ আলি ‘ইমরান, আয়াত নং ৫৪) মুনাফিকরা তাদের ষড়যন্ত্রের জন্য শাস্তি পাবে মহান আল্লাহর সত্ত্বা প্রতারণা ও উপহাস থেকে পবিত্র। মহান আল্লাহ কাফিরদের প্রতারণা ও বিদ্রƒপের উপযুক্ত প্রতিফল দিবেন। কাজেই বিনিময়ে পূর্বোক্ত আয়াতের ঐ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। দু’টি শব্দের অর্থ দুই জায়গায় পৃথক পৃথক হবে। যেমন কুর’আন মাজীদে আছেঃ ﴿وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَةٍ سَیِّئَةٌ مِّثْلُهَا١ۚ فَمَنْ عَفَا وَ اَصْلَحَ فَاَجْرُهٗ عَلَى اللّٰهِ﴾ মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোষ-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে। (৪২ নং সূরাহ্ শূরা, আয়াত নং ৪০) অন্য স্থানে রয়েছেঃ ﴿فَمَنِ اعْتَدٰى عَلَیْكُمْ فَاعْتَدُوْا عَلَیْهِ﴾ তারপর যে কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করে, তাহলে সে তোমাদের প্রতি যেরূপ অত্যাচার করবে তোমরাও তার প্রতি সেরূপ অত্যাচার করো। (২ নং সূরাহ্ বাকারাহ, আয়াত নং ১৯৪) এতে বুঝা গেলো যে, প্রতিশোধ গ্রহণ করা অন্যায় নয়। বাড়াবাড়ি মুকাবিলায় প্রতিশোধ নেয়া বাড়াবাড়ি নয়। কিন্তু দু’স্থানে একই শব্দ আছে, অথচ প্রথম অন্যায় বাড়াবাড়ি হচ্ছে যুল্ম এবং দ্বিতীয় অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে সুবিচার। আর একটি ভাবার্থ এই যে, মুনাফিকরা তাদের এই নাপাক নীতি দ্বারা মুসলিমগণকে উপহাস ও বিদ্রƒপ করতো। মহান আল্লাহও তাদের সাথে এরূপই করলেন যে, দুনিয়ায় তাদেরকে তিনি নিরাপত্তা দান করলেন, তারা এতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলো, অথচ এটা অস্থায়ী নিরাপত্তা। কিয়ামতের দিন তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। এখানে যদিও তাদের জান ও মাল রক্ষা পেলো, কিন্তু মহান আল্লাহর নিকট তারা বেদনাদায়ক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে। মুনাফিকদেরকে উদ্ভ্রান্তের মধ্যে ছেড়ে দেয়ার অর্থ কী ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) উপরোক্ত কথাটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা বিনা কারণে যে ধোঁকা ও বিদ্রপ হয়, মহান আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে প্রতিশোধ হিসেবে মহান আল্লাহর দিকে এসব শব্দের সম্বন্ধ করায় কোন দোষ নেই। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-ও এ কথাই বলেন যে, এটা তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ ও শাস্তি। يَمُدُّهُمْ-এর অর্থ ‘ঢিল দেয়া (তাফসীর তাবারী ১/৩১১) এবং বাড়ানো’ (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/৫৭) বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ ﴿اَیَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِه مِنْ مَّالٍ وَّ بَنِیْنَۙ نُسَارِعُ لَهُمْ فِی الْخَیْرٰتِ بَلْ لَّا یَشْعُرُوْنَ﴾ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্য স্বরূপ যে ধন ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি দান করি তার দ্বারা তাদের জন্য সর্বপ্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না। (২৩ নং সূরাহ্ মু’মিনূন, আয়াত নং ৫৫-৫৬) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ ﴿ سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَیْثُ لَا یَعْلَمُوْنَ﴾ আমি তাদেরকে এমনভাবে ক্রমে ক্রমে ধরবো যে, তারা জানতে পারবে না। (৬৮ নং সূরাহ্ কলম, আয়াত নং ৪৪) কতিপয় তাফসীর কারকের মতে তারা যখনই কোন অন্যায় করে বসবে এর বিনিময়ে তাদের সম্পদ-সুখ স্বাচ্ছন্দ অর্জিত হবে। যা প্রকৃত অর্থে শাস্তিই বটে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُكِّرُوْا بِه فَتَحْنَا عَلَیْهِمْ اَبْوَابَ كُلِّ شَیْءٍ حَتّٰۤى اِذَا فَرِحُوْا بِمَاۤ اُوْتُوْۤا اَخَذْنٰهُمْ بَغْتَةً فَاِذَا هُمْ مُّبْلِسُوْنَ. فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ. তাদেরকে যে নাসীহত করা হয়েছিলো তারা যখন তা ভুলে গেলো, তখন আমি তাদের জন্য যাবতীয় নি‘য়ামতের দরজা খুলে দিলাম; পরিশেষে, তাদের যা দেয়া হলো তাতে তারা যখন আনন্দে মেতে উঠলো, হঠাৎ করে তাদের ধরে বসলাম। তখন যাবতীয় কল্যাণ থেকে তারা নিরাশ হয়ে গেলো। অতঃপর যারা যুল্ম করেছিলো তাদের শিকড় কেটে দেয়া হলো। আর সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালকের, যিনি অন্যায়কারীদের শিকড় কেটে দিয়েছেন। (৬ নং সূরাহ আল আন‘আম, আয়াত নং ৪৪ ও ৪৫) ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন, সঠিক কথা হলো তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যই তাদেরকে অধিক পরিমাণে অবকাশ দেয়া হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿وَ نُقَلِّبُ اَفْـِٕدَتَهُمْ وَ اَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ یُؤْمِنُوْا بِهۤ اَوَّلَ مَرَّةٍ وَّ نَذَرُهُمْ فِیْ طُغْیَانِهِمْ یَعْمَهُوْنَ﴾ ‘আর যেহেতু তারা প্রথম বার ঈমান আনেনি, এর ফলে তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দিবো এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই বিভ্রান্ত থাকতে দিবো।’ (৬ নং সূরাহ্ আন‘আম, আয়াত নং ১১০। তাফসীর তাবারী ১/৩০৭) ‘তুগিয়ান’ এ শব্দটি এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে সীমালঙ্ঘন করা হিসেবে, যেমন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াতে উল্লেখ করেনঃ ﴿ اِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَآءُ حَمَلْنٰكُمْ فِی الْجَارِیَةِ﴾ যখন প্লাবন হয়েছিলো তখন আমি তোমাদেরকে অর্থাৎ মানব জাতিকে আরোহণ করিয়েছিলাম নৌযানে। (৬৯ নং সূরাহ্ হাক্কাহ, আয়াত নং ১১) যাহ্হাক ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে في طغيانهم يعمهون এর তাফসীরে বলেন, ‘তারা তাদের কুফরীতে ঘোরপাক খাচ্ছে।’ সুদ্দী, আবুল ‘আলিয়া, কাতাদাহ, রাবী‘ ইবনু আনাস, মুজাহিদ, আবূ মালিক এবং ‘আব্দুর রহমান ইবনু যায়দও বলেছেন ‘তারা তাদের কুফরী ও ভ্রষ্টতার মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, এ আয়াতে ‘আমাহ’ শব্দটি প্রয়োগ করার অর্থ হচ্ছে পথচ্যুত হওয়া বা সরে যাওয়া। তিনি আরো বলেন যে, ‘তুগইয়ানিহীম ইয়া‘মাহুন’ হলো তাদেরকে অবিশ্বাস এবং বিপথগামী ঘিরে রেখেছে যার ফলে তারা সন্দেহের ঘোরে নিপতিত রয়েছে এবং তা থেকে বের হয়ে আসার সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছেনা। কারণ মহান আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং দৃষ্টিশক্তিকে রুদ্ধ করে দিয়েছেন। ফলে তারা হিদায়াতের পথ খুঁজে পাচ্ছে না এবং তাদের পথচ্যুতি থেকেও বেরিয়ে আসতে পারছে না। (তাফসীর তাবারী ১/৩০৯) কেউ কেউ বলেন, العمي বলা চোখের অন্ধত্বকে আর العمه বলা হয় অন্তরের অন্ধত্বকে। অবশ্য অন্তরের অন্ধত্ব বুঝাতেও العمي ব্যবহার হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿لَا تَعْمَى الْاَبْصَارُ وَلٰكِنْ تَعْمَى الْقُلُوْبُ الَّتِیْ فِی الصُّدُوْرِ﴾ প্রকৃতপক্ষে চোখ অন্ধ নয়, বরং বুকের ভিতর যে হৃদয় আছে তা-ই অন্ধ। (২২ সং সূরাহ আল হাজ্জ, আয়াত নং ৪৬)


Post a Comment

0 Comments